ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের জেরে প্রবল ঝড়ে পুদুচেরির ইয়ানামে একাধিক গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশ কয়েকটি বাড়ি। রাস্তায় গাছ ও ভাঙা ডালপালা পড়ে যান চলাচলও ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে উদ্ধার ও রাস্তা পরিষ্কারের কাজ চালাচ্ছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF)।

এনডিআরএফের কমান্ডার ঈশ্বর রাও গাড়ে জানিয়েছেন, একটি বড় বটগাছ ভেঙে একটি বাড়ির উপর পড়েছে। সেই গাছ সরানোর কাজ করছে উদ্ধারকারী দল। তিনি জানান, ঝড়ের সময় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি ছিল। এর ফলে বহু গাছ উপড়ে পড়েছে এবং চারটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঈশ্বর রাও গাড়ে বলেন, “আমাদের দলে ৩০ জন কর্মী রয়েছেন। এখনও পর্যন্ত কোনও প্রাণহানির খবর নেই। উদ্ধারকারী দল পৌঁছনোর আগেই বাড়ির বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এখন বাড়ির উপর থেকে গাছ সরানোর কাজ চলছে।”
ইয়ানামে ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র চিহ্নিত
ইয়ানামের পুলিশ সুপার বরধা রাজন জানিয়েছেন, মঙ্গলবার থেকেই পুলিশ সতর্ক রয়েছে। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্যান্য দফতরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ চলছে। তিনি জানান, মঙ্গলবার রাতে ঘণ্টায় প্রায় ১২০ কিলোমিটার বেগে ঝড় ও ভারী বৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে পুলিশ। এখনও পর্যন্ত কোনও প্রাণহানির খবর নেই।
ইয়ানামের রাজস্ব দফতর ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র চিহ্নিত করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। পুলিশ, এনডিআরএফ এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (SDRF) যৌথভাবে রাস্তায় ও বসত এলাকায় পড়ে থাকা গাছ সরানোর কাজ করছে। পুলিশ সুপার আরও জানান, শহর ও গ্রামীণ এলাকার বিভিন্ন জায়গায় গাছ উপড়ে পড়লেও সামগ্রিক পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে। পুদুচেরি প্রশাসন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষও উদ্ধারকাজে সাহায্য করছে।
স্থলভাগে প্রবেশের প্রক্রিয়া চলেছে: আবহাওয়া দফতর
বুধবার সকালে ভারতের আবহাওয়া দফতর (IMD) জানিয়েছে, অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় অর্ণব পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলের কাছে প্রায় একই জায়গায় অবস্থান করছিল। ২৮ অক্টোবর, বুধবার ভোর ৫টা ৩০ মিনিটের বুলেটিন অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টির অবস্থান ছিল ১৬.৪ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮২.০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এটি অন্ধ্রপ্রদেশের নারসাপুর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্বে, ইয়ানাম থেকে ৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে, কাকিনাড়া থেকে ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে, মছলিপত্তনম থেকে ৯০ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তরপূর্বে এবং বাপটলা থেকে ১৭০ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তরপূর্বে অবস্থান করছিল।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে বাপটলা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী উপকূল দিয়ে, ইয়ানামের দক্ষিণের কাছাকাছি এলাকা অতিক্রম করতে পারে। সেই সময় বাতাসের স্থায়ী গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার এবং ঝোড়ো হাওয়ার সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
বুলেটিনে আরও জানানো হয়, ঘূর্ণিঝড়ের উত্তর দিকের মেঘের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যেই স্থলভাগে ঢুকে পড়েছে। ঝড়ের কেন্দ্র উপকূলের খুব কাছাকাছি রয়েছে। স্থলভাগে প্রবেশের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে আরও প্রায় দুই ঘণ্টা লাগতে পারে বলে জানিয়েছিল আবহাওয়া দফতর। এর আগে আইএমডি সতর্ক করেছিল, ঘূর্ণিঝড়ের পিছনের অংশ উপকূলে প্রবেশ করলে ল্যান্ডফল প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হবে। সেই সময় উপকূলের একাধিক জেলায় প্রবল হাওয়া, ভারী বৃষ্টি এবং উত্তাল সমুদ্রের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
মছলিপত্তনম থেকে বিশাখাপত্তনম—বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়েছে অন্ধ্রপ্রদেশের মছলিপত্তনমেও। মঙ্গলবার রাত থেকে সেখানে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টি শুরু হয়। বহু গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে। মঙ্গলবার রাত থেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা বন্ধ রয়েছে। টানা বৃষ্টিতে নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়েছে এবং একাধিক রাস্তায় জল জমেছে। ফলে স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। কোনাসীমা জেলার বিভিন্ন এলাকাতেও প্রবল হাওয়া ও বৃষ্টিতে গাছ উপড়ে পড়েছে। এর জেরে কয়েকটি জায়গায় যাতায়াতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। কাকিনাড়ার একাধিক এলাকায় গাছ উপড়ে পড়ার পাশাপাশি বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গিয়েছে। বিশাখাপত্তনমেও ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় গাছ ভেঙে পড়েছে। এর ফলে বিচ রোড ও সীতাম্মাধারা এলাকার রাস্তায় যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
বিশাখাপত্তনমের আরকে বিচে প্রবল হাওয়া ও উঁচু ঢেউ দেখা যায়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশ সাধারণ মানুষের সমুদ্রসৈকতে প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কাছেও একটি গাছ উপড়ে পড়েছে। বিজয়ওয়াড়া ও আশপাশের এলাকায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ভারী বৃষ্টি এবং দমকা হাওয়া হয়েছে। নিচু এলাকা ও প্রধান রাস্তাগুলিতে জল জমেছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি চলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আধিকারিকেরা।
পরিস্থিতি পর্যালোচনা মুখ্যমন্ত্রীর, দ্রুত রাস্তা ও বিদ্যুৎ পরিষেবা ফেরানোর নির্দেশ
বুধবার অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নায়ডু ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা, উদ্ধারকাজ এবং পরিষেবা পুনরুদ্ধারের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। প্রায় ৩২ হাজার আধিকারিক ও মাঠপর্যায়ের কর্মীর সঙ্গে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি কথা বলেন। মুখ্যমন্ত্রী রাস্তার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ পরিষেবা দ্রুত স্বাভাবিক করার নির্দেশ দিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলিতে খাবার, জল-সহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার উপরেও জোর দিয়েছেন তিনি। সাধারণ মানুষের অসুবিধা কমাতে দ্রুত পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের প্রাথমিক হিসাব তৈরি করতে বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি, রাস্তায় পড়ে থাকা গাছ সরিয়ে দু’ঘণ্টার মধ্যে যান চলাচল স্বাভাবিক করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার ও ত্রাণের কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, এখনও পর্যন্ত কোনও প্রাণহানির খবর নেই। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় রাজ্যে মোট ২,১৯৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ১৪টি জেলায় ১২টি এনডিআরএফ দল এবং ১০টি এসডিআরএফ দল মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি, চিকিৎসক দল, অ্যাম্বুল্যান্স, জরুরি চিকিৎসার শয্যা এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
ওড়িশাতেও সতর্কতা, বিমান পরিষেবায় প্রভাব
এদিকে, ঘূর্ণিঝড় অন্ধ্রপ্রদেশের দিকে এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওড়িশার রাজস্ব ও বিপর্যয় মোকাবিলা মন্ত্রী সুরেশ পূজারি রাজ্যের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা কেন্দ্রের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হল কোনও প্রাণহানি হতে না দেওয়া। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বিশাখাপত্তনম, বিজয়ওয়াড়া এবং রাজামুন্দ্রীর বিমান পরিষেবাও ব্যাহত হয়েছে। একাধিক বিমান সংস্থা তাদের উড়ান বাতিল করেছে। বেসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের তরফে যাত্রীদের বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে উড়ানের বর্তমান অবস্থা যাচাই করে নিতে বলা হয়েছে। উড়ান বাতিল বা দেরি হলে যাত্রীদের আগাম জানানো এবং প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী টিকিট পুনরায় বুক করা বা টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।