পাক আমলাদের দেশ ছাড়ার হিড়িক!

পাকিস্তানের তাবড় আমলা এবং উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিকদের মধ্যে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাকাপাকিভাবে স্থায়ী হওয়ার প্রবণতা বা হিড়িক নিয়ে বর্তমানে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। খোদ পাকিস্তানের মন্ত্রীর মুখে এই দেশত্যাগের প্রসঙ্গ উঠে আসার পর আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা। এই পুরো পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের প্রাক্তন গোয়েন্দা অফিসার তথা পাকিস্তান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ তিলক দেবাশের তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক

পাক মন্ত্রীর বিস্ফোরক অভিযোগ:
​পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে (পূর্বতন টুইটার) একটি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি দেশটির সিনিয়র আমলা ও সরকারি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁর অভিযোগ:
​চাকরির মেয়াদকালেই প্রস্তুতি: পাকিস্তানের বহু প্রভাবশালী ও উচ্চপদস্থ আমলা সরকারি পদে বহাল থেকেই গোপনে বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য পূর্বপরিকল্পনা করে রেখেছেন।
​পর্তুগালের প্রতি ঝোঁক: অতীতে কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য পছন্দ হলেও বর্তমানে পাক আমলাদের কাছে স্থায়ীভাবে বসবাসের নতুন হটস্পট বা পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে পর্তুগাল।
​দেশের প্রতি নিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন: মন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, যে সমস্ত আমলারা দেশের সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা ভোগ করেছেন, তাঁরা কি আদতে পাকিস্তানকে শুধুমাত্র একটি ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ বা সাময়িক যাত্রাপথ হিসেবে ব্যবহার করছিলেন? দেশের প্রতি তাঁদের কোনো প্রকৃত দায়বদ্ধতা নেই?
​মাঝপথেই মধ্যস্থতাকারীর চম্পট: খোয়ালা আসিফ আরও দাবি করেন, এই সমস্ত প্রভাবশালী আমলাদের জন্য পর্তুগালে স্থায়ী বসবাসের বা রেসিডেন্সির ব্যবস্থা করে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তি মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।
​২. ভারতের প্রাক্তন গোয়েন্দা অফিসারের প্রতিক্রিয়া (‘কিছু তো গড়বড়’):
​পাকিস্তানের মন্ত্রীর এই বার্তার পর নড়েচড়ে বসেছেন কূটনৈতিক মহল। ভারতের প্রাক্তন গোয়েন্দা আধিকারিক এবং পাকিস্তান বিশেষজ্ঞ তিলক দেবাশের এই ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন—
​”পাকিস্তানে গুরুতর কিছু একটা গড়বড় চলছে (Something is seriously wrong in Pakistan)। প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ফাঁস করেছেন যে, বহু সরকারি আধিকারিক চাকরিররত অবস্থাতেই বিদেশে পাকাপাকিভাবে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন। যেহেতু আমলারা মাটির নিচের খবর সবার আগে রাখেন, তাই একে কি ‘ডুবে যাওয়া জাহাজ ছেড়ে ইঁদুরদের পালিয়ে যাওয়ার’ মতো ঘটনা বলা চলে? শুধু প্রশ্নটা রাখলাম।”

অন্তর্নিহিত কারণ ও প্রেক্ষাপট:
​বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার পেছনে একাধিক গভীর কারণ রয়েছে:
​রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সেনাবাহিনীর প্রভাব: পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোয় বেসামরিক সরকারের পাশাপাশি সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনীরের ক্রমবর্ধমান ও নিরঙ্কুশ প্রভাব এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে প্রশাসনিক মহলেও অস্বস্তি রয়েছে।
​অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট: অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং সামগ্রিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশের ভবিষ্যতের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন খোদ সরকারি ব্যবস্থার চালিকাশক্তিরা।
​দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার অভাব: অতীতেও পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজাতদের বিদেশে বেনামি সম্পত্তি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠলেও এই প্রথম সরকারের কোনো হেভিওয়েট মন্ত্রী সরাসরি আমলাদের এই দেশত্যাগের হিড়িককে জনসমক্ষে নিয়ে এলেন।
​সংক্ষেপে বলতে গেলে, পাক মন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তি এবং ভারতীয় প্রাক্তন গোয়েন্দা অফিসারের বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি কতখানি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে এবং দেশের ওপর থেকে তাদের নিজেদের নীতি-নির্ধারকদেরই আস্থা উঠতে শুরু করেছে।