জলে ভাসমান ড্রাম খুলতেই বেরিয়ে এল লাশ!

ময়মনসিংহে হাড়হিম কাণ্ড! প্লাস্টিকের ড্রাম খুলতেই বের হল লাশ!

আর প্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্কঃ জলে ভাসছিল একটি প্লাস্টিকের ড্রাম। প্রথমে দেখে হয়তো বোঝার উপায় ছিল না সেই ড্রামের ভিতর লুকিয়ে রয়েছে এক ভয়াবহ রহস্য। ময়মনসিংহের বেগুনবাড়ি এলাকায় স্লুইস গেটের কাছে ড্রামটি ভাসতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশকে খবর দেন। ড্রামটি উদ্ধার করে খুলতেই ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে এক ব্যক্তির দেহ। পরে পুলিশ জানতে পারে, নিহত ব্যক্তি ৫০ বছরের নিরঞ্জন চন্দ্র সূত্রধর। তিনি পেশায় গয়নার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ও ময়মনসিংহের আথারবাড়ি বিল্ডিং এলাকায় যৌথ মালিকানায় একটি গয়নার দোকান চালাতেন।

নিরঞ্জনের পরিচয় প্রথমে জানা যায়নি। তাঁর ট্রাউজারের পকেট থেকে পাওয়া যায় ময়মনসিংহ হিন্দু কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেডের একটি টোকেন। সেই টোকেনের সূত্র ধরেই পুলিশ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে। এরপর ধীরে ধীরে সামনে আসে নিহতের ব্যক্তির পরিচয়। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের পর তাঁর স্ত্রী সুমিতা রানি সূত্রধর এবং ছেলে জয় সূত্রধরও দেহ শনাক্ত করেন। পুলিশ জানিয়েছে, নিরঞ্জনের মাথা ও বুকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। সেই কারণে তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, ড্রামের ভিতরে দেহ ঢোকানোর আগেই তাঁকে প্রাণহানি করা হয়ে থাকতে পারে।

আরও জানা যাচ্ছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে নিখোঁজ ছিলেন নিরঞ্জন। ময়মনসিংহ শহরের স্টেডিয়াম এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে থাকতেন তিনি। পরিবার সূত্রে জানা যায়, এর আগে কখনও কখনও কয়েক দিনের জন্য বাড়ির বাইরে থাকতেন নিরঞ্জন। সেই কারণে প্রথমদিকে তাঁর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি নিয়ে পরিবার আশঙ্কা করেনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেগুনবাড়ির স্লুইস গেটের কাছে ভাসতে থাকা ড্রামের ভিতর থেকে উদ্ধার হল তাঁর দেহ। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন নিরঞ্জনের জীবন কে বা কারা শেষ করল? কেনই বা তাঁর দেহ ড্রামের ভিতরে ভরে জলে ফেলে দেওয়া হল? এই প্রশ্নগুলির কোনও উত্তর এখনও পুলিশের হাতে নেই। শুক্রবার পর্যন্ত ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করার খবরও পাওয়া যায়নি। এই ঘটনায় এখনও নিশ্চিতভাবে কিছু জানায়নি তদন্তকারীরা। ফলে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে একাধিক প্রশ্ন।

এই ঘটনার পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। লেখিকা তসলিমা নাসরিনও সামাজিক মাধ্যমে এই ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, যতদূর শুনেছি লোকটি ত্রিশালের বাসিন্দা ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী। আশ্চর্য, সব হিন্দুকে কি শেষ করে ফেলবে মুসলমানরা?
সব হিন্দু জমি দখল করে নেবে? তাদের টাকা পয়সা লুট করে নেবে? বাড়িঘর পুড়িয়ে দেবে? আমি জানি না কী করে হিন্দুরা বাস করছে ওই জেহাদিস্তানে কোনও সুস্থ ও সভ্য মানুষ তো ওই হিংস্র, বর্বর ও অসভ্য মুসলমানের দেশে বাস করতে পারবে না, সম্ভব নয়।

নিরঞ্জন চন্দ্র সূত্রধরের ঘটনার সঙ্গে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা এখনও তদন্তে নিশ্চিত হয়নি। ফলে এই মুহূর্তে সেটিকে সাম্প্রদায়িক হামলা হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার মতো তথ্যও সামনে আসেনি। পুলিশের তদন্তেই পরিষ্কার হবে, এই হত্যার নেপথ্যে আসল কারণ কী। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপট একেবারে নতুন নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতেও নরসিংদীতে চঞ্চল চন্দ্র ভৌমিক নামে এক হিন্দু গ্যারেজকর্মীর প্রাণহানি ঘিরে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। রাতে গ্যারেজের ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় আগুনে পুড়ে মারা যায় সে। ঘটনাটি দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ। তা নিয়ে তদন্ত হয়েছিল। পুলিশের হাতে থাকা সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনাস্থলের কাছে সন্দেহজনক গতিবিধির কথাও সামনে আসে। চঞ্চলের পরিবার ও স্থানীয়দের একাংশ ঘটনাটিকে পরিকল্পিত বলে অভিযোগ করেছিলেন।

চঞ্চল ভৌমিক ছিলেন নরসিংদীতে কর্মরত এক তরুণ গ্যারেজকর্মী। বাংলাদেশের নরসিংদী পুলিশ লাইনের কাছে খানাবাড়ি মসজিদ বাজার এলাকায় যে গ্যারেজে তিনি কাজ করতেন। সেখানেই রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আগুন লাগার পর তাঁকে আর জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের তরফে তখন জানানো হয়েছিল, আগুন কীভাবে লাগল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে ও সিসিটিভি ফুটেজও পরীক্ষা করা হয়েছে। একদিকে নরসিংদীর সেই ঘটনা অন্যদিকে ময়মনসিংহে ড্রামের ভিতর থেকে নিরঞ্জনের দেহ উদ্ধার। পরপর এমন ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ, অভিযুক্তদের পরিচয় এবং উদ্দেশ্য তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া জরুরি। নিরঞ্জন চন্দ্র সূত্রধরের মৃত্যুর ঘটনায় এখনও একাধিক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। কে বা কারা তাঁকে খুন করল? কী কারণে এই ঘটনা ঘটল? তদন্তেই মিলবে সেই উত্তর।