একদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা! অন্যদিকে, বর্তমান সামলাতেই নাজেহাল তরুণ প্রজন্ম! শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার খরচ থেকে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা—একাধিক ইস্যুতে জমছিল ক্ষোভ। আর সেই ক্ষোভই শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরণের আকার নিল জার্মানির রাজপথে!

হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর স্লোগানে কেঁপে উঠল বার্লিন, ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ-সহ ৩৪টি শহর। কিন্তু যে আন্দোলনের ডাক ছিল নিজেদের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর, সেই আন্দোলনের শেষ পরিণতি কেন হল হিংসা, ভাঙচুর আর লুটপাট? কারা ঢুকে পড়ল শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ভিড়ে? আর জার্মানির এই অশান্তির পিছনে কি শুধুই অর্থনৈতিক অসন্তোষ, নাকি আরও বড় কোনও রাজনৈতিক বার্তা?
জার্মানির এই আন্দোলনের নাম—‘Gen Z Regelt’, অর্থাৎ জেন জি এবার নিজেরাই পরিস্থিতি সামলাতে চায়! আবার ‘Gen Z has got this!’ নামেও পরিচিত এই যুব আন্দোলনের মূল সুর একটাই—তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাঁদের মতামতকেও গুরুত্ব দিতে হবে।হ্যালোউইনের দিনটিকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল দেশজুড়ে আন্দোলনের জন্য। আয়োজকদের দাবি, ৩৪টি শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল এই কর্মসূচি। তাঁদের হিসেব অনুযায়ী, দেশজুড়ে এক লক্ষেরও বেশি মানুষ অংশ নেন। আর এই আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল ছয়টি মূল দাবি। যার মধ্যে অন্যতম জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো, পরিবেশের সুরক্ষা এবং বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের বিরোধিতা।প্রশ্ন উঠছে, ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ জার্মানির তরুণ প্রজন্মের এত ক্ষোভ কেন?
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, একদিকে প্রতিদিন বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম, অন্যদিকে পড়াশোনার খরচ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আর্থিক সঙ্কট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিকাঠামোর অভাব, শিক্ষক ও গবেষকদের চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ভবিষ্যৎ ক্রমশ অন্ধকার দেখছেন তাঁরা।হ্যানোভার থেকে বার্লিনে বিক্ষোভে যোগ দিতে এসেছিলেন ২৩ বছরের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী ভেরোনিকা ডিন্টার। তাঁর বক্তব্য, পড়াশোনার খরচ চালাতে তাঁকে পার্টটাইম কাজ করতে হচ্ছে। শুধু তাঁর একার নয়, গোটা প্রজন্মের কাছেই শিক্ষা ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।আর এখানেই সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ আন্দোলনকারীদের। তাঁদের দাবি, শিক্ষা ও সামাজিক পরিষেবায় বরাদ্দ কমানো হচ্ছে, অথচ সামরিক খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরো খরচ করতে পিছপা হচ্ছে না সরকার। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরজ্- সরকারের নীতির বিরুদ্ধেই তাই সরব তরুণরা।
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা নিয়ে উদ্বেগ। ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে জার্মানিতে সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানোর আলোচনা চলছে। আর সেই প্রেক্ষাপটে তরুণদের আশঙ্কা, তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।ড্রেসডেনে বিক্ষোভকারীদের হাতে দেখা যায় প্ল্যাকার্ড—‘ধনীরা যুদ্ধ চায়, যুবসমাজ চায় ভবিষ্যৎ!’ আবার কোথাও লেখা, ‘তোমরা সব গুলিয়ে দিয়েছ, এবার জেন জি সামলাবে!’কিন্তু দিনের আলোয় যে বিক্ষোভের ছবি ছিল শান্তিপূর্ণ, সন্ধ্যা নামতেই সেই ছবিতে এল নাটকীয় বদল!ফ্রাঙ্কফুর্ট ও কোলনে বিক্ষোভ ঘিরে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। মুখোশধারী কয়েকজন বিক্ষোভকারী দোকানের কাচ ভাঙতে শুরু করেন। একাধিক জায়গায় লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং আতশবাজি ছোড়ার ঘটনা ঘটে। ফ্রাঙ্কফুর্টে জরুরি পরিষেবার কর্মীদের লক্ষ্য করে মলোটভ ককটেল ছোড়ার অভিযোগও ওঠে। এমনকি একটি বন্দুকের দোকানের জানলা ভাঙার পর অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি এক সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।কোলনে পরিস্থিতি সামাল দিতে জলকামান ব্যবহার করতে হয় পুলিশকে। হামবুর্গে ব্যারিকেডে আগুন লাগানো এবং জরুরি পরিষেবার কর্মীদের লক্ষ্য করে আতশবাজি ও নির্মাণসামগ্রী ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। বার্লিনেও প্রায় ৬০ জনকে আটক করা হয়। পুলিশের দাবি, রাজধানীতে ২৭ জন পুলিশকর্মী সামান্য আহত হয়েছেন।
তাহলে কি জেন জি-র আন্দোলনই হিংসার পথে হাঁটল? নাকি আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল অন্য কোনও শক্তি? জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ডের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে হিংসাত্মক বামপন্থী গোষ্ঠী এবং অভিবাসী সম্প্রদায়ের কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলে। হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোজেকের দাবি, ফ্রাঙ্কফুর্টের বিক্ষোভে প্রায় ১০০ জন চিহ্নিত বামপন্থী চরমপন্থী ঢুকে পড়েছিল।যদিও এই অভিযোগের পাল্টা বক্তব্যও রয়েছে। আন্দোলনের আয়োজকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিক্ষোভ শেষ হওয়ার পর কী ঘটেছে, তার উপর তাঁদের কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না। অর্থাৎ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে হিংসার সঙ্গে এক করে দেখতে নারাজ তাঁরা।এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বহু তরুণের বক্তব্য, হিংসার ঘটনাকে সামনে এনে তাঁদের মূল দাবিগুলিকে আড়াল করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, পুলিশের উচিত শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে তাঁদের সমস্যাগুলি শোনা।আর এই ক্ষোভ কিন্তু শুধু জার্মানির মধ্যে আটকে নেই। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি, স্পেনে, সার্বিয়া—ইউরোপের একাধিক দেশে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষ রাজপথে দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক বিক্ষোভও সেই বৃহত্তর ছবিরই অংশ।অর্থাৎ, ইউরোপের তরুণ প্রজন্মের সামনে
এখন একটাই বড় প্রশ্ন—যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে তাঁদের বড় করা হয়েছে, বাস্তবে সেই ভবিষ্যৎ কি আদৌ তাঁদের নাগালে?জার্মানির আন্দোলন তাই শুধুই কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা নয়। এর ভিতরে রয়েছে শিক্ষা, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, যুদ্ধের আশঙ্কা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তরুণদের অংশগ্রহণের দাবি।তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন একটাই—তরুণদের এই ক্ষোভকে সরকার কতটা গুরুত্ব দেবে? আর আন্দোলনের নামে যারা হিংসা ছড়াচ্ছে, তাদের থেকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে কতটা আলাদা রাখতে পারবে জার্মানি?কারণ, রাজপথে আগুন জ্বালিয়ে নয়, ভবিষ্যৎ গড়ার অধিকার নিয়েই পথে নেমেছিল জেন জি। সেই দাবির আওয়াজ কি শেষ পর্যন্ত হিংসার শব্দে হারিয়ে যাবে? নাকি জার্মানির রাজনীতি শুনতে বাধ্য হবে নতুন প্রজন্মের কথা?