Date : 2020-06-05

মার্কিন বিমান হামলায় নিহত সোলেইমানি, আল-মুহানদিস

ওয়েব ডেস্ক : বাগদাদে আমেরিকান এমব্যাসিতে ইরানের মদতপুষ্ট শিয়াপন্থী তাণ্ডবকারীদের হামলা চালানোর বদলা নিল ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে অব্যর্থ নিশানার বিমান হামলায় বাগদাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নিহত হয়েছে ইরানি রিপালিকান গার্ডের প্রধান কাসিম সোলেইমানি এবং খাতাইব হেজবোল্লা বাহিনীর মাথা আবু মাহদি আল-মুহানদিস। এটা আমেরিকান সেনাবাহিনীর দিক থেকে একটা বড় জয়।

আরও পড়ুন :এটিএমে টাকা তুলতে গেলে এবার লাগবে ওটিপি, নতুন নিয়ম এসবিআইয়ের

কাসিম সোলেইমানি এবং আল-মুহানদিস, দুজনেই আরব দুনিয়ার বুকে ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমেরিকান প্রশাসন তথা পেন্টাগনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সোলেইমানির আল-কুদস ফোর্স এবং আল-মুহানদিসের হেজবোল্লা ব্রিগেড উভয় সন্ত্রাসবাদী বাহিনীই কয়েকশ আমেরিকান নাগরিক ও ইরাকি কোয়ালিশন ফোর্সের সদস্যের মৃত্যুর জন্য দায়ী। এছাড়া বিগত কয়েক বছরে তাদের আক্রমণে জখমের সংখ্যা কয়েক হাজার। গত ২৭ ডিসেম্বর খাতাইব হেজবোল্লা অর্থাৎ আল-মুহানদিসের হেজবোল্লা ব্রিগেডের রকেট হামলায় এক আমেরিকান কন্ট্রাক্টকর সহ বেশ কয়েক জন ইরাকি সেনা অফিসার নিহত হন। তার পরেই ইরাক-সিরিয়া সীমান্তে খাতাইব হেজবোল্লার হেডকোয়ার্টার্সে আমেরিকার সেনাবাহিনী বিমান অভিযান চালায়। প্রত্যুত্তরে ইরাকের মার্কিন এমব্যাসিতে তাণ্ডব করে সোলেইমানি এবং আল-মুহানদিসের সশস্ত্র অনুগামীরা। এদের ভয়ে ইরাকের সরকার পর্যন্ত তটস্থ। স্বাভাবিকভাবেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে পুঙ্খানুপুঙ্খে খবর নিয়ে অব্যর্থ নিশানায় আবারও বিমান আক্রমণ চালাল আমেরিকান সেনাবাহিনী। শুক্রবার ভোরের হামলায় বাগদাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে তারা ইরানি রিপাবলিকান গার্ডের প্রধান সোলেইমানি এবং হেজবোল্লা ব্রিগেডের কমান্ডার আল-মুহানদিস উভয়কেই উড়িয়ে দিল।

আরও পড়ুন : নিত্যযাত্রীদের সঙ্গে ট্রেনে সওয়ার হনুমান, দেখুন ভিডিও

ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া-র (আইএসআইএস) ঘাতকদের বিস্তার ঠেকাতে ইরানি মদতে, ২০১৪ সালে ইরাকে শিয়াপন্থী পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স (পিএমএফ) গড়ে তোলে আল-মুহানদিস। কিন্তু আসল লক্ষ্য ছিল ইরাকে কট্টর শিয়াপন্থী সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হেজবোল্লা ব্রিগেডের প্রভাব বাড়ানো। মাত্র দুই বছরে তাদের ক্ষমতা এতটাই বাড়ে যে, ইরাকি আইন অনুসারে ২০১৬ সালে এই ফোর্সকে সরকারি স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় বাগদাদের সরকার। স্বেচ্ছাধীন সামরিক শক্তি হিসাবে তাদের দাপট এখন আরও বেড়েছে। যে কোনও প্রশ্নে সরাসরি ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আঙুল তুলে কথা বলার অধিকার তাদেরই আছে।

এক দিকে এই হেজবোল্লা ব্রিগেড, আর এক দিকে সোলেইমানির আল-কুদস বা ইরানি রিপাবলিকান গার্ড ইরাকের মানুষের জীবনে এক অশুভ সংকেত বয়ে এনেছে। ইরাকে শিয়া-সুন্নি জনসংখ্যা নিয়ে বরাবরই একটা ধন্দ রয়েছে। মিশরের কিংবদন্তি সামরিক শাসক গামাল আবদেল নাসেরের অনুগামী বাথ পার্টির শাসনে যখন ইরাক তখন সেখানে শিয়া-সুন্নি অনুপাত দেখানো হত ৪৫:৫৫। সাদ্দাম হুসেনের আমলে সরকারি হিসাবে সেই অনুপাত দাঁড়ায় ৩৫:৬৫। যদিও সাদ্দাম হুসেনের পতনের পর হিসাবটা উলটে যায়। জানা যায়, সেদেশে শিয়াদের সংখ্যা বেশি, সুন্নিদের সংখ্যা কম। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হুসেন ক্ষমতাচ্যুত হওয়া থেকে এই দুই গোষ্ঠীকেই সেদেশে ক্ষমতার পাল্লায় সমান-সমান রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে আমেরিকার প্রশাসন। দক্ষিণ ও পূর্ব ইরাকের শিয়াপন্থী মুসলমানদের মধ্যে অবশ্য ব্রিটিশদের প্রভাব বেশি।

আইএসআইএসের প্রধান আল-বাগদাদি, আমেরিকা না রাশিয়া, কাদের হাতে নিহত হয়েছে তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে। বছর তিনেক আগে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছিল, তাদের বিমান হামলায় ইরাকে আল-বাগদাদি নিহত হয়েছে। কিন্তু এই খবর বের হওয়ার কয়েক মাস বাদে আবার ‘আল-বাগদাদি’ ভেসে ওঠে। ইসলামিক স্টেটের পক্ষ থেকে ছবি দেখিয়ে দাবি করা হয়, বাগদাদি-র মৃত্যু হয়নি। সে বেঁচে আছে। গত বছরের শেষে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে এক ভিডিও ফুটেজে ঘোষণা করেন, সিরিয়া সীমান্তে আমেরিকান বিমান হামলায় বাগদাদি নিহত হয়েছে। যদিও সে নিহত হওয়ার আগেই গত তিন-চার বছরে ইরাক ও সিরিয়ায়, আমেরিকা ও রাশিয়া, উভয় দেশের বিমান হামলায় আইএসের ক্ষমতা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যায়। আইএস-কে একটা সময়ে ক্রমাগত মদত দিয়েছিল এরদোগানের তুরস্ক।

আরও পড়ুন : রাত-বিরেতে কবরস্থান থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে কঙ্কাল

সিরিয়া ও ইরাকে আইএসের এলাকা সংকুচিত হওয়ার সুযোগ নেয় সোলেইমানির রিপাবলিকান গার্ড এবং আল-মুহানদিসের হেজবোল্লা ব্রিগেড। ইজরায়েল-সিরিয়া এবং ইরাক-সিরিয়া সীমান্ত বরাবর তেহরানের মদতে তারা শিবির বিস্তার করে। শত শত হেজবোল্লা অনুগামী সেখানে আত্মঘাতী জঙ্গি বা ফিদায়েঁ হিসাবে তালিম পায়। ইরানি রিপাবলিকান গার্ডদের বাহিনী আল-কুদস এদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়, মগজ ধোলাই করে। ঢালাও অর্থ সাহায্য দেয় তেহরান। একদিকে ইজরায়েলকে ধ্বংস করা, অন্যদিকে ইরাককে মুঠোয় পোরাই এই আল-কুদস ও হেজবোল্লা ব্রিগেডের লক্ষ্য।

আরও পড়ুন :তালিবানি ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন এখন আমেরিকারই বড় বিপদ

সীমান্তবর্তী লেবাননের হেজবোল্লা শিবিরগুলিতে একের পর এক বিমান হামলা চালিয়ে এর আগে আন্তর্জাতিক মহলে ধিক্কৃত হয়েছে ইজরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স আইডিএফ। কিন্তু তাদের আক্রমণে ইজরায়েলের ওই প্রতিবেশি দেশে সন্ত্রাসবাদী সাপের অনেক ডেরাই তছনছ হয়ে যায়। সে কারণেই ২০০৮-’০৯ সাল থেকে হেজবোল্লা ব্রিগেড ইজরায়েল-সিরিয়া সীমান্ত বরাবর ঘাঁটি গাড়ার লক্ষ্য নিয়ে এগতে থাকে। যদিও এই শিয়াপন্থী সন্ত্রাসবাদীদের শিবিরগুলি এখন আমেরিকা ও রাশিয়া উভয় সেনাবাহিনীর রেডারের নীচে রয়েছে, তা সত্ত্বেও হেজবোল্লা বাহিনীর সংখ্যা পিঁপড়ের মতো বাড়ছে। কারণ, চেচনিয়ার মহিলা সন্ত্রাসবাদীদের মতো কট্টর শিয়াপন্থী মহিলারা হেজবোল্লারও সহায়। আরব-আফগানিস্তান-পাকিস্তানের কট্টরপন্থী সুন্নি সন্ত্রাসবাদীদের মতো খোমেইনিপন্থী সন্ত্রাসবাদীদের মত-পথ-প্রণালী নারী-বিবর্জিতা নয়।

আরও পড়ুন :কফির সঙ্গে এবার কাপটাও খেয়ে ফেলতে হবে বিমান যাত্রীদের

এই ধরনের বহু মাথাওয়ালা সাপের একটা-দুটো মাথা কেটে নিলে, সাপটা মরে যায় না। তবু, বাগদাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে মার্কিন বিমান আক্রমণে আল-কুদস প্রধান কাসিম সোলেইমানি ও খাতাইব হেজবোল্লা প্রধান আল-মুহানদিসের নিহত হওয়ার ঘটনা বিশ্ব সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অবশ্যই একটা বড় সাফল্য।