Date : 2020-12-03

রাজনীতি নাকি গান, সাফ জানালেন গায়ক পর্ণাভ

ওয়েব ডেস্ক: রাজনীতি থেকে সঙ্গীত ও পরিবার। সবদিকেই তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি। একের পর এক সাফল্য। এতদিন স্বর্ণালী যুগের গানে ও রাজনীতিতেই তাঁর পরিচিতি ছিল সর্বাধিক। তবে এবার সেই মুকুটে জুড়লো আরও একটি নতুন পালক। ৪৩ তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার থিম সং-টি গেয়েছেন তিনি। যা একেবারে বাঙালিআনায় ভরপুর। বোঝাই যাচ্ছে কার কথা বলা হচ্ছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও গায়ক পর্ণাভ ব্যানার্জী। তাঁর ব্যস্ত সময় থেকেও কিছুটা সময় তিনি দিলেন আরপ্লাস ওয়েবকে। বললেন তাঁর প্রফেশনাল জীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের নানান কথা।
আরপ্লাস ওয়েব: ৩১ জানুয়ারি উদ্বোধন হয়েছে ৪৩ তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা। আর এই বছরের বইমেলা যে নিঃসন্দেহে তোমার ফ্যানেদের কাছে আলাদা অনুভূতি তা বলতে বাকি রাখে না। এবছরের কলকাতা বইমেলার থিম সং তার কন্ঠস্বর তোমার। কেমন ছিল এই জার্নি?
পর্ণাভ: একেবারে অন্যরকম একটা অনুভূতি। এই নিয়ে দুবার আমার বইমেলা থিম মিউজিক করা। ২০১৬-তে বইমেলার থিম ছিল বলিভিয়া। তখন থিম সং করেছিলাম একবার। তারপর ২০১৯। এই বছর বইমেলার থিম গুয়াতেমালা। মায়া সভ্যতার কনসেপ্টটা মাথায় রেখে ল্যাটিন আমেরিকা ফোক মিউজিকের একটা ফ্লেভার গানটায় রাখা হয়েছে। কিন্তু তারমধ্যেও বাঙালিআনা কোথাও বাদ যায়নি। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন বিশ্ব বাংলায় বিশ্ব বইমেলা। তাই বিশ্ব বাংলা কথাটা মাথায় রেখে সবকিছু নিয়ে গানটা তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আর একটা কথা বলতে হয়, বইমেলার থিম মিউজিক তৈরি করতে মাথায় রাখতে হয়েছে শুধু বই নিয়ে গান নয়। কারণ এরকম অনেকেই আসেন যারা কলেজ পাশ আউটের বহুদিন পর আবার বইমেলাতে দেখা করছেন। কিংবা এমনও অনেকে রয়েছেন যারা প্রথম বইমেলায় আসছেন। প্রেম ভালোবাসা সব মিলিয়ে গানটা তৈরি করা। যাতে এই গান শুনলে একটা বারতি আনন্দ পায় সকলে। আর এই গানটি লিখেছেন রাজীভ দত্ত।

আরপ্লাস ওয়েব: বইমেলার থিম মিউজিক বইমেলা বাদে আর কোথায় কোথায় পাওয়া যাবে? যারা গানটি ডাউনলোড করতে চায় তাদের কোথা থেকে গানটি পেতে সুবিধা হবে?
পর্ণাভ: বুক ফেয়ারের এই থিম মিউজিক কলকাতা বইমেলার ওয়েব সাইটে গেলেই পাওয়া যাবে। এছাড়া ইউটিউব থেকেও ডাউনলোড করা যাবে। এছাড়া যতদিন বইমেলা চলছে ততদিন ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতেও এই গান শোনা যাবে।
আরপ্লাস ওয়েব: অনেকেই বলেন তোমার কন্ঠে বাংলা স্বর্ণালী যুগের গান বেশি শোনা যায়। সেই তুলনায় এই যুগের গানের তালিকা যেন কোথাও একটু কম। তারা জানতে চান এই যুগের গান নিয়ে তোমার কি চিন্তাভাবনা?
পর্ণাভ: সেখানে স্বর্ণালী যুগের গানের দর্শক বেশি। নতুন গানের অডিয়েন্স অবশ্যই রয়েছে। তবু এখনও দর্শকরা স্বর্ণালী যুগের গানের বেশি অনুরোধ করেন। অনেকক্ষেত্রে আয়োজকরা অনুষ্ঠানের আগে বলে দেন স্বর্ণালী যুগের গান বেশি করে গাইতে। তবে আমার একটা কথা মনে হয়, এখনকার গানে কোথাও যেন বাঙালিআনা বড়ই ক্ষীণ। সেই এক্স ফ্যাক্টরটা বেশ মিসিং। যেটা একটা গানকে দীর্ঘদিন মনে রেখে দেওয়া যায়। সেই কারণে খুব ভালো কম্পোজিশনও বেশিদিন স্টে করছে না। অনেকেই বেশ কিছু গান দু-তিন বছর শোনার পর আর শুনতে চান না। এর কারণ বলতে আমার মনে হয়, বাঙালার যে একটা নিজস্ব ঘরানা রয়েছে তা একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে।
আরপ্লাস ওয়েব: বর্তমানে ট্যালেন্ট হান্টের মাধ্যমে আমরা অনেক সঙ্গীত শিল্পী যেমন পেয়েছি, তেমন অনেক শিল্পী হারিয়ে গিয়েছে। তোমার কি মনে হয় ট্যালেন্ট হান্টের মাধ্যমে সত্যিই শিল্পস্বত্ত্বা মূল্যায়ন করা সম্ভব?
পর্ণাভ: দেখ এক্ষেত্রে শুরুতেই বলি আমি নিজে একটা ট্যালেন্ট হান্ট থেকে উঠে এসেছি। যেটা বাংলার প্রথম ট্যালেন্ট হান্ট শো ছিল। সালটা ২০০৬। তাই আমি কখনওই বলব না ট্যালেন্ট হান্টের মাধ্যমে সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তাই বলে আমি এটাও দাবি করবো না যে আমার নাম চারিদিকে পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমি ধারাবাহিকতা বজায় রেখে গান নিয়ে এগিয়েছি। এমন নয় যে, মাঝে হারিয়ে গিয়েছিলাম আবার হঠাৎ করে এসেছি। আমি নিজে একটা কথা বিশ্বাস করি, স্লো বাট স্টেডি। বর্তমান ট্যালেন্ট হান্ট থেকে কিন্তু গুণী শিল্পীদের পাওয়াও যাচ্ছে। আসলে এখন বেশির ভাগ ছেলেমেয়েই খুব ভালো গান গায়। আর তারা যে নিয়মিত রেওয়াজ বা সাধনা করে সেটা তাদের গান শুনলেই বোঝা যায়। কম বেশি সকলেই ভালো গান গায়। তবে এর ফলে একটা সমস্যা হচ্ছে। কোয়ান্টিটি এতটাই বেড়ে যাচ্ছে যে কোয়ালিটি কোথাও ধাক্কা খাচ্ছে। আর গান গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু জিনিসও প্রয়োজন। অনেকক্ষেত্রেই গায়ক বা গায়িকার সঙ্গে মিডিয়ার সম্পর্ক কেমন সেটা ম্যাটার করে। আসলে আমি বাড়িতে বসে একটা গান গাইলাম তাতেই হয়ে গেল ব্যাপারটা একেবারেই তেমন নয়। পাবলিসিটিও দরকার। প্রতিটি শিল্পীর জন্যই প্রচার প্রয়োজন হয়।

আরপ্লাস ওয়েব: শিল্পী মানেই ছকে বাঁধা চাকরি বা মাইনে নয়। বছরের নির্দিষ্ট একটা সময় কাজের চাপ থাকে। তাই এমন অনেক শিল্পী রোজগারের জন্য বিকল্প পথ বেছে নেন। শিল্পীদের ক্ষেত্রে কি তাহলে শিল্পসত্ত্বা প্রধান বা যথেষ্ট নয়?
পর্ণাভ: দেখো আমরা স্বেচ্ছায় এই পেশাকে যারা বেছেছি তারা অনিশ্চয়তা জেনে নিয়েই বেছেছি। আমাদের কাজের বিশেষ সময় রয়েছে। যেমন কালিপুজো থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত আমাদের একটা সিজন থাকে। তারপর আমাদের কাছে সাত-আট মাসের যে গ্যাপ থাকে তখন নিজের সৃষ্টির দিকে নজর দিই আমরা। এছাড়া আমি নিজে নানা সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকি। যদি একজন খেলোয়াড়কে দেখি তাহলে সে কিন্তু সারা বছর বড় ম্যাচ খেলে না। কোনও বড় ম্যাচ খেলার জন্য সে নিজেকে বছরের বাকি সময় প্রস্তুত করতে থাকে। আমাদের ক্ষেত্রে এই বড় ম্যাচের ডিউরেশন দু থেকে তিন মাস। এই দু থেকে তিনমাস যাতে আমরা ভালো ভাবে কাডটা করতে পারি সেদিকে নজর দিই।
আরপ্লাস ওয়েব: তুমি তো একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। প্রফেশন আর রাজনীতি কিভাবে ম্যানেজ করো?
পর্ণাভ: আমি প্রত্যক্ষ ভাবে রাজনীতি করি না। তবে অবশ্যই আমি শাসকদলের সমর্থক। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শকে সমর্থন করি, সম্মান করি। ওঁনার লড়াকু মানসিকতাকে স্যালুট করি। তাই ওঁনার সকল পদক্ষেপে আমি সামিল হই। রাজনৈতিক মুভমেন্টের সঙ্গে সবসময় থাকি। আর ওঁনাকে সর্বভারতীয় স্তরে দেখতেও চাই। তাই বলে আমি কখনোই গানের সঙ্গে রাজনীতি মিলিয়ে ফেলি না। আমি নিজের শিল্পী সত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়ে কখনওই রাজনীতি চর্চা করি না। আমি গায়ক পর্ণাভ হিসেবে আগে। গান আর রাজনীতি দুটোই আমার কাছে নিজের নিজের জায়গায় রয়েছে।

আরপ্লাস ওয়েব: তোমার হাতে এখন কি কি কাজ রয়েছে?
পর্ণাভ: এই মূহুর্তে কলকাতা বইমেলার কাজ শেষ হল। এছাড়া শ্রীজাতদা-র লেখা একটা গানে কাজ করছি। কবির সুমনের ওপর একটা ট্রিবিউট-এর কাজ চলছে। এছাড়া শ্রীজাতদা-র আরও একটা লেখা দেবসেনের সুরে একটা গানের কাজ চলছে। এখন তো আর আটটা দশটা করে গানের অ্যালবাম হয় না। সিঙ্গলসের যুগ। তাই পরপর দুটো গান আসতে চলেছে। এর পাশাপাশি একটি চ্যানেলের সঙ্গে কাজ চলছে। সেটাও থিম মিউজিক। সব গুণী ব্যক্তিরা এখানে বাজাবেন। গানটা আমার কম্পোজ করা।
আরপ্লাস ওয়েব: সম্প্রতি তুমি বাবা হয়েছো। দায়িত্বভার আগের চেয়ে আরও বেড়েছে। কিভাবে ক্যারিয়ার আর পরিবার দুটোকে সামলাও?
পর্ণাভ: পুজোর সময় এত ব্যস্ততা চলে তখন পরিবারকে আলাদা করে সময় দেওয়া হয় না। আর অনুষ্ঠান করে বাড়ি ফিরে এসে দেখি মেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। যদিও সকালের দিকে মেয়ের সঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করি। আমার মেয়েরও গানের প্রতি একটা আগ্রহ রয়েছে। আমরাও চাই ও যাতে গানের সঙ্গেই থাকে। তবে পরিবার সামলানোর কথা বলতে হলে, আমার মিসেস পুরো বিষয়টা দেখে নেয়। নিজের কর্মজীবনের পাশাপাশি পরিবারের দেখভাল সব আমার মিসেস-ই সামলায়।
আরপ্লাস ওয়েব: আরপ্লাস ওয়েবের পাঠকদের জন্য তুমি কি বার্তা দেবে?
পর্ণাভ: আরপ্লাস চ্যানেল আমার ভীষণ প্রিয় চ্যানেল। এখানে আমার অনেক পরিচিতরাই রয়েছেন। তাদের প্রতিটা অনুষ্ঠানই অনবদ্য। চ্যানেলের সঙ্গে আরপ্লাস ডিজিটাল মিডিয়া হয়ে একেবারে যুগোপযোগী কাজ। এতে আরও সহজেই আরপ্লাসের সঙ্গে থাকা যাবে। পাঠকদের বলব বেশি করে আরপ্লাসের খবর পড়ুন। যাতে আরও বেশি করে ছড়িয়ে পড়ে আরপ্লাস ওয়েব তার জন্য বেশি করে খবর শেয়ার করুন। সেই সঙ্গে আরপ্লাসের পাশে থাকুন। আগামী দিনে অনেক সাফল্য কামনা রইল আরপ্লাস ওয়েবের জন্য।