Date : 2019-12-06

লাল চিনকে পছন্দ করে না হংকং

ওয়েব ডেস্ক : এখন যে হংকং দেখে তাক লেগে যায় এক সময় সেখানেই যে কাদা আর পচা পাঁক ছাড়া কিছু ছিল না তা বোধহয় কেউ ভাবতেও পারবে না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপ্টেনরা তখন দূর প্রাচ্যে বাণিজ্য বাড়াতে প্রথমে নোঙর ফেলার মতো উপকূলে ভিড়ছেন, তার পর বন্দর বানানোর জায়গা খুঁজছেন। ১৭৬৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। ‘লন্ডন’ জাহাজের ক্যাপটেন টমাস অ্যালভেস ডেক থেকেই দূরবীণ লাগিয়ে দেখতে পেলেন অদ্ভূত একটা দ্বীপ। মূল ভূখণ্ডের খুব কাছে। মূল ভূখণ্ড আর দ্বীপের মাঝখান দিয়ে বয়ে গিয়েছে সমুদ্রের জল। কিন্তু সেখানে জাহাজ ঢোকানো যাবে কি? চিন্তায় পড়লেন ক্যাপটেন। তবু হাল ছাড়লেন না। নেভিগেটরের কেরামতিতে ‘লন্ডন’ ভিড়ল দ্বীপের উত্তর উপকূলে।

আরও পড়ুন : জন্মের ৩ ঘন্টার মধ্যে সন্তান হারা হয়েছেন, ২ মাস ধরে অন্যশিশুদের স্তন্যদান করছেন মা

আরও পড়ুন :ধর্ষণের প্রতিবাদে জ্বলছে হায়দরাবাদ, তারমধ্যেই ৬বছরের শিশুকে ধর্ষণ রাজস্থানে

ক্যাপটেন টমাস অ্যালভেস জায়গাটার নাম দিলেন হিয়ং কং। কিন্তু স্থাননাম নিয়ে বিরোধ বাধল ক্যাপটেন ক্যাপটেনে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আর এক ক্যাপটেন ছিলেন আলেকজান্ডার ড্যালরিম্পল। অস্ট্রেলিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়ার অসংখ্য দ্বীপ ও সেইসঙ্গে চিনের সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে তাঁরও চামড়া তামাটে হয়ে গিয়েছে। ঝগড়ুটে বলে তাঁর নাম-ডাক ছিল। ড্যালরিম্পল টমাস অ্যালভেসের মত মানলেন না। তিনি তাঁর লগবুকের ফুটনোটে লিখলেন, “ও (অ্যালভেস) যাকে হিয়ং কং বলছে, ওই জায়গাটার নাম আসলে ফ্যানচিন চাউ।” চিনা মাল্লারা তাঁকে বলেছে। কে ঠিক, কে বেঠিক তা নিয়ে বিলেতে বেশ কিছু দিন তোড়ফোড় চলল। মাঝখান থেকে লাভ হল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি-র। এমন একটা জায়গা, মহামান্য চিন সম্রাট জানেনই না, তাঁর রাজত্বে এই দ্বীপ আছে। পরিশ্রমী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেখানেই ইউনিয়ন জ্যাক পুঁতল। প্রায় বিনি পয়সায় জায়ফল আর জৈত্রী তুলে জাহাজের খোলে ভরে, অথৈ সাগর পাড়ি দিয়ে, তার পর ইউরোপে সেই মশলাপাতি বেচে যারা ১২৫ শতাংশের বেশি নাফা করত, কাদাভরা দ্বীপে দাঁড়িয়ে তাদের ক্যাপটেনরা অনেক অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পেলেন।

এইখানে খুঁটি গাড়লে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে অনায়াসেই হারিয়ে দেওয়া যাবে। বাণিজ্যে লক্ষ্মীর বসত। কিন্তু দেবসেনাপতি কার্তিক লক্ষ্মীর ভাই। লক্ষ্মীর ধন নিয়েই দেবাসুরে যুদ্ধ। ১৮৩৯ সালে বাধল আফিম যুদ্ধ। ইংরেজ বণিকেরা চিন সম্রাটের সামনে যেদিন হাঁটু গেড়ে কুর্নিশ জানিয়েছিলেন, সেদিন ‘দিল্লিশ্বরোবা জগদীশ্বরোবা’ মুঘল সম্রাটের মতো অকর্মণ্য চিনা সম্রাটও অহংকারে মট মট করছিলেন। আঁচ করতে পারেননি, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপটেনরা হাঁটু গেড়েছেন আসলে তাঁর সিংহাসনটাকেই উলটে দেবেন বলে। চিনারা তখনও উত্তুরে মোঙ্গলদের ভয়ে ভোগে। যদিও মোঙ্গলরা তত দিনে পুরোপুরি বৌদ্ধ। তিব্বতিদের মতোই যুদ্ধটুদ্ধ তারা বহুকাল আগে ভুলে মেরে দিয়েছে। তবু চিনাদের ভয় যায় না। এই বোধহয় সুনামির ঢেউয়ের মতো বিনা রেকাবের ছোট ছোট ঘোড়া নিয়ে চেঙ্গিজ খানের বংশধররা পালে পালে ঝাঁপিয়ে পড়ল! আগে এ রকম বহুবার হয়েছিল। রাতে যখন চিনা সম্রাটেরা আমোদ-প্রমোদে মত্ত তখনই জ্বলন্ত মশাল হাতে হু-হুংকারে পঙ্গপালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে মোঙ্গল ঘোড়সওয়াররা। রাতারাতি উবে গিয়েছে একের পর এক চিনা রাজত্ব।

আরও পড়ুন : জেএনইউ-তে সরকারি ভূমিকায় অখুশি নির্মলার স্বামী

ফলে বংশ পরম্পরায় চিনা সম্রাটদের ভয় ছিল তাঁদের সাম্রাজ্যের উত্তর দিক নিয়ে। কিন্তু দুটো গোরামুখো লোক সমুদ্রপথে এমন একটা জায়গা থেকে এল, যে জায়গাটা চিনারা চেনেও না-জানেও না, যাদের ভাষা বোঝা দায়, ধম্মো-কম্মো সেই কবেকার মার্কো পোলোদের মতো, তারাই যে একদিন ঠান্ডামাথায় পৃথিবীর কেন্দ্রের স্বর্গরাজ্যে কামান দাগবে, সেটা চিনা সম্রাট ও তাঁর মান্ডারিনরা ভাবতেও পারেননি। আফিম যুদ্ধের সময় হংকং ব্রিটিশ ক্রাউন কলোনি-র সামরিক বন্দরে রূপান্তরিত হল। যুদ্ধ চলল ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নীতিই ছিল নরমে-গরমে শনৈ শনৈ রাজ্য বিস্তার। আফিম যুদ্ধের নিট ফল হিসাবে হংকংয়ে উড়ল ইউনিয়ন জ্যাক।

১৮৬০ সালে হংকং লাগোয়া উপদ্বীপ কাওলুন-ও ব্রিটিশ অধিকারে এল। বাড়তে লাগল হংকং। হংকং ছাড়া ম্যাকাওয়ের দিকেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নজর ছিল। কিন্তু ম্যাকাও তুলতে তাদের কিছুটা সময় লেগেছিল। ম্যাকাওয়ের দখলদারি নিয়ে স্প্যানিয়ার্ড, পর্তুগিজ, ফরাসিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কম ছিল না। শেষ পর্যন্ত ডাচদের পরাস্ত করে ব্রিটিশরাই জিতল। ১৮৯৮ সালে হংকং আর ম্যাকাও মিলিয়ে নিউ টেরিটরির ৯৯ বছরের লিজ পেল ব্রিটেন। ১৯৮৫ সাল। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখনও ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পায়নি। হোয়াইট হাউস আর ক্রেমলিনের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ আদৌ থামবে কি না, কেউ জানে না। কমিউনিস্ট চিন তখন উন্নত পশ্চিমা দুনিয়ার ‘নির্ভরযোগ্য’ বন্ধু।

আফগানিস্তানে রুশ ফৌজ তখনও ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে। কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদকে ক্রমাগত মদত দিচ্ছে এক বিচিত্র অর্কেস্ট্রা। সেই সময়েই লন্ডন আর বেজিংয়ের মাখো মাখো মিতালি এক নতুন গাঁটছড়ায় রূপান্তরিত হল। রাজকীয় ব্রিটেন চিনা কমিউনিস্টদের জানিয়ে দিল, তারা হংকং ছেড়ে দেবে। ম্যাকাওয়েরও আর দরকার নেই। ১৯৯৭ সালের পর নতুন কোনও লিজেরই আর প্রয়োজন নেই। চিনই হংকং নিক। কিন্তু হংকং কি তাই চেয়েছিল? হংকংবাসী অবাক হয়ে দেখলেন, পশ্চিমা গণতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা কেউই আর এই হাতবদলের প্রশ্নে গণভোটের কথা বললেন না। কাশ্মীর নিয়ে যাঁরা ইসলামাবাদের গা-জোয়ারি আর গণভোটের দাবিকে মর্যাদা দেন তাঁরাই হংকং আর ম্যাকাওকে নিষ্ঠুর অগণতান্ত্রিক বেজিংয়ের মুখে ফেলে দিলেন। এই পশ্চিমা নেতানেত্রীরা তখন কিন্তু ভেবেও দেখেননি, একদিন এর প্রতিবাদে হংকংয়েরই ছেলে, ‘এন্টার দ্য ড্রাগনে’র হিরো ব্রুস লি-র মতো হংকংয়ের তরুণ ড্রাগনেরা ফুঁসে উঠবে। চিনা ‘হান’-রা তাদের দমাতে পারবে?